Published On: Tue, Aug 28th, 2018

সক্ষমতা মূল্যায়ন শুরু করছে জাতিসংঘ

সব সূচক ঠিক থাকলে ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশ কোথায় কোথায় সুবিধা হারাবে, তার মূল্যায়নের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জাতিসংঘের এই স্বাধীন সংস্থাটির পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসছে। এই সফরে তারা পরিকল্পনা কমিশন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ (ইআরডি) বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করবে। জাতীয় আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাক্ষরতার হারের অগ্রগতি নিয়ে সিডিপির ‘প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি’ ২০১৯ সালের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হবে কি না, ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো যখন পর্যালোচনা বৈঠকে বসবে জাতিসংঘ, তখন সিডিপির প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ায় সক্ষম কি না তা অনেকটা নির্ভর করবে সিডিপির ‘প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনের’ ওপর। সে জন্য সিডিপির প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছে সরকার।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের আগে মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকের সব শেষ অগ্রগতি এবং সূচকগুলো কতটা টেকসই তা নিয়ে আলাদা দুটি প্রতিবেদন তৈরি করবে জাতিসংঘ। যার মধ্যে ‘প্রভাব মূল্যায়ন’ প্রতিবেদনটি তৈরি করবে সিডিপি; যেখানে স্থান পাবে মাথাপিছু জাতীয় আয় এবং মানবসম্পদ সূচকের বিভিন্ন দিক। আরেকটি প্রতিবেদন তৈরি করবে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আংকটাড। সংস্থাটি কাজ করবে ‘অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা’ সূচক নিয়ে, যেখানে গুরুত্ব পাবে দেশের আমদানি-রপ্তানির সব শেষ চিত্র। এ ছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য ও কৃষি খাতের অবস্থাও দেখবে আংকটাড। ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো যখন বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষণ করা হবে, তখন আংকটাডের প্রতিবেদনটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম মনে করেন, আংকটাড ও সিডিপি যত দ্রুত তাদের প্রতিবেদন তৈরি করবে, তত বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল। কারণ তাদের প্রতিবেদন দেখে ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে। বাংলাদেশের  জন্য কোথায় কোথায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, সেটিও জানা যাবে।

সিডিপির পাশাপাশি আংকটাডও যাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক নিয়ে দ্রুত মূল্যায়ন শুরু করে, সে অনুরোধ জানাতে সরকারের একটি প্রতিনিধিদল আগামী ২ সেপ্টেম্বর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আংকটাডের সদর দপ্তরে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব কাজী শফিকুল আযমের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে থাকছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদা বেগম, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের যুগ্ম প্রধান মফিদুল ইসলাম ও ইআরডির উপসচিব আনোয়ার হোসেন। ওই সফরে আংকটাডের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের বৈঠকের কথা রয়েছে।

ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আযম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আংকটাড যাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক নিয়ে দ্রুত মূল্যায়ন কাজ শুরু করে, আমরা সে অনুরোধ জানাতে জেনেভা যাচ্ছি। আমরা আশা করছি, ২০১৯ সালের শুরুতে তারা মূল্যায়ন কাজে হাত দেবে এবং একই বছর প্রতিবেদনটি জমা দেবে। ২০২১ সালে দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশ নিয়ে যখন পর্যালোচনা করা হবে, তখন সিডিপি ও আংকটাডের প্রতিবেদন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই, ২০২১ সালের আগেই প্রতিবেদন দুটি তৈরির কাজ শেষ হোক।’

ইআরডির দেওয়া তথ্য মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে তিনটি সূচকের মধ্যে সব কটিই পূরণ করতে সক্ষম হওয়ায় গত মার্চে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিপত্র দেয়। ২০২১ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রেখে ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে জাতিসংঘের।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), বিশ্বব্যাংকসহ বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি), শুল্কমুক্ত, কোটামুক্তসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা হারাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে প্রথমে বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর। জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো আয় (রেমিট্যান্স) এবং উন্নত দেশ থেকে সরকারিভাবে দেওয়া সহযোগিতা (ওডিএ) কমে যাবে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর রপ্তানিতেও বড় আঘাত আসবে। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা থেকে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) পেয়ে আসছে। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে গেলে জিএসপি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে রপ্তানিতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার যে সুযোগ পেয়ে আসছে বাংলাদেশ, সেটি আর থাকবে না। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি করা পণ্যে অতিরিক্ত ৬.৭ শতাংশ শুল্ক বসবে। এতে করে বছরে রপ্তানি কমবে ২৭০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ এখন যেমন মেধাস্বত্বের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করে সেটি বিদেশে রপ্তানি করে। উন্নয়নশীল দেশ হলে সে সুবিধা আর থাকবে না।

পরিকল্পনা কমিশন ও ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অর্থনীতিবিদরা যেসব তথ্য দিচ্ছেন, সেগুলো প্রাথমিক তথ্য। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হলে কোথায় কোথায় সুযোগ-সুবিধা হারাবে তার বিস্তারিত তথ্য এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। জিইডি এরই মধ্যে একটি বিস্তারিত সমীক্ষার কাজ শুরু করেছে। জাতিসংঘের দুটি সংস্থা সিডিপি ও আংকটাডও দ্রুত প্রভাব মূল্যায়ন ও ভঙ্গুরতার পথ নকশা তৈরির কাজ শুরু করবে বলে আশাবাদ কর্মকর্তাদের।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও সদ্য জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্টের (সিডিপি) সদস্য নিযুক্ত হওয়া দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে তার তাৎপর্য কী, সেটি মূল্যায়ন করতে বাংলাদেশ সফরে আসছেন সিডিপির কর্মকর্তারা। যেকোনো দেশ যখন এলডিসি থেকে উত্তরণ করতে চায়, ওই দেশের লাভ-ক্ষতি, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে মূল্যায়ন করে থাকে সিডিপি ও আংকটাড। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়া অবশ্যই গর্বের। তবে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর যেসব ঝুঁকি দেখা দেবে, তা মোকাবেলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।’

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>