নাক, কান ও গলা’র অসুখ-বিসুখ, চিকিৎসা ও পরামর্শ

থাইরোগ্লোসাল সিস্ট (Thyroglossal Cyst):থাইরোগ্লোসাল সিস্ট হলে গলার ঠিক মাঝ বরাবর ছোট্ট একটি অংশ ফুলে থাকে। আসলে এই ফুলে থাকা অংশটিই হলো সিস্ট। এর ভেতরে পানির মতো তরল থাকে। সাধারনত শিশুদের জন্মের পরে এই সমস্যাটি দেখা দিতে পারে তবে পরিণত বয়সেও এটি দেখা দিতে পারে। এটা আসলে একটি জন্মগত ত্রুটি, থাইরয়েড হরমোন গ্রন্থিটির নিচে নামার পথটি রয়ে গেলেই এই সমস্যা দেখা দেয়। শিশু ঢোক গেলার সময় বা জিহবা বের করলে এই সিস্টটি গলার সামান্য উপরের দিকে উঠে আসে, এটা দেখেই চিকিৎসকেরা এই রোগটি সনাক্ত করে থাকেন। এটির একমাত্র চিকিৎসা হলো অপারেশন করে সিস্ট টি ফেলে দেয়া। এই অপারেশনের নাম সিস্ট্রাঙ্ক অপারেশন। শিশু সার্জন বা নাক কান গলা সার্জন উভয়েই এই অপারেশন করতে অভিজ্ঞ বলে ধরে নেয়া হয়।

সাইনুসাইটিস (Sinusitis): মুখমন্ডল ও মস্তিস্কের হাড়কে হাল্কা করার সুবিধার্তে এর ভেতরে কিছু বায়ুকুঠুরি আছে যার নাম সাইনাস (Sinus), আর এর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন এর জন্য যেই রোগটি হয় তাই আমাদের অতিপরিচিত সাইনুসাইটিস(Sinusitis)। মাথার হাড়ে এমন চারটি সাইনাস রয়েছে, এর মধ্যে ম্যাকজিলারি ওফ্রন্টাল সাইনাস দুটি বড় তাই রোগ ও এতে বেশী হয়। এরা নাকের গর্তে গিয়ে শেষ হয়। মাথার হাড়ের ওজন কমানো ছাড়াও মানুষের মুখের শব্দকে ভারী এবং কিছুটা নাসিকাময় করায় এদের ভূমিকা আছে। সাধারণত ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমনেই সাইনুসাইটিস হয়ে থাকে। তবে নাকে আঘাত পাওয়া, এলার্জি, ঠান্ডা লাগা, ধুলাবালু, নাকের হাড় বাকা হয়ে যাওয়া, নাকে টিউমার হওয়া নানাবিধ কারন গুলো এ রোগের প্রকোপ অনেকগুনে বাড়িয়ে তোলে। নাক দিয়ে অবিরত পানি পরা বা হটাৎ করে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়াটা সাইনুসাইটিস রোগের একদমই পরিচিত একটি উপসর্গ। সেই সাথে তীব্র-দীর্ঘ ও বিরক্তিকর মাথা ব্যথা তো রয়েছেই, সাইনাস গুলোর ঠিক উপরেও একটা চাপা ব্যথা থাকে। মাথা ভারী ভারী লাগা ও সবকিছু খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া এরোগটিকে নানাভাবে তীব্র অস্বস্তিকর একটি রোগে পরিনত করে। অনেক সময় এর সাথে জর, গা ম্যাজ ম্যাজ করা এবং মানসিক অবসাদ যোগ হয়ে রোগীকে ভীত করে তোলে।অনেকের এই রোগটি বছরে কয়েকবার হয়ে থাকে, বিশেষ করে যারা বিভিন্ন এলার্জিতে ভোগেন, তাই এরোগ এড়াতে ঐসব ব্যাপারে বিশেষ সাবধান হওয়া আবশ্যক। শুষ্ক, খোলামেলা এবং যথেষ্ট আলো বাতাস আছে এমন ঘরে বসবাস সাইনুসাইটিসের সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস করে। এতো কিছুর পরও যদি এরোগ হয়েই যায় তাহলে নাক,কান,গলা বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক, হিস্টাসিন জাতীয় কিছু অসুধ এবং প্যারাসিটামল এরোগে বেশ কার্যকারিতার দাবী রাখে। সেই সাথে নাকে বাষ্পের ভাপ নেয়া, পুষ্টিকর ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়া এবং বিশ্রাম নেয়া এরোগে বেশ আরাম দেয়।

এডেনয়েড (Adenoid): এডেনয়েড একধরনের টনসিল, এর অবস্থান নাকের গভীরে একদম পেছনের দিকে গলার উপরিভাগে। এর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হলে এটা বড় হয়ে যায় এবং নানাবিধ সমস্যা ও উপসর্গের আবির্ভাব ঘটে। বাচ্চাদের এডেনয়েড বড় হয়ে গেলে তাদের শ্বাসকষ্ট হয় এবং তাদের নাকের বদলে মুখ (Mouth breather) দিয়ে শ্বাস নিতে দেখা যায়। এজন্য বাচ্চারা খেতে চায়না এবং তাদের স্বাস্থ্য খারাপ থাকে। এডেনয়েড বড় হলে গলার স্বর পরিবর্তিত হতে পারে এবং বাচ্চা কানে কম শোনা শুরু করে। এ ধরনের শিশুদের কানপাকা (Otitis Media) রোগ হবারও সুযোগ থাকে। অনেকদিন ধরে এ রোগে ভূগতে থাকলে এক সময় শিশুটির মুখ দিয়ে সবসময় লালা ঝরে পরতে থাকে (Drooling)। দাঁত উচু নিচু হয়ে যাওয়া, নাক বোঁচা হয়ে যাওয়া, চেহারা বোকা বোকা হয়ে যাওয়া, রাত্রে বিছানায় প্রসাব করে দেয়া (Enuresis) এসব উপসর্গও কালক্রমে একসময় শিশুটির কষ্টের কারণ হয়ে উঠতে পারে। নাক কান গলা বিশেষজ্ঞগণের তত্ত্বাবধানে এই রোগের চিকিৎসা করানো উচিত। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করালে এন্টিবায়োটিক, নাকের ড্রপ ও হিস্টাসিন জাতীয় অসুধ সেবনে এই রোগ নিয়ন্ত্রনে থাকে। সেই সাথে শ্বাসের কিছু ব্যয়াম করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, খোলামেলা পরিবেশে থাকা ইত্যাদি বিষয় গুলোও রোগীকে সুস্থ্য রাখতে সাহায্য করে। এডেনয়েড খুব বড় হয়ে গেলে অপারেশন (Adenoidectomy) করানো ছাড়া এটা ভালো হয়না। যে সকল শিশুর এডেনয়েড বড় হবার কারনে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হয় বা শ্বাস কষ্ট হয় তাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

টনসিলাইটিস (Tonsillitis): বাচ্চাদের গলায় ব্যথা হলেই আমরা বলে দেই – “তোমার তো টনসিল হয়েছে”। অমনিই জোটে এটা খাবেনা, ওটা করবেনা এমন একগাদা উপদেশ। তো এই টনসিল টা কী? টনসিল হলো আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটা অংশ এবং আমাদের মুখের ভেতরেই চারটি গ্রুপে তারা অবস্থান করে। এদের নাম যথাক্রমে লিঙ্গুয়াল, প্যালাটাইন, টিউবাল এবং এডেনয়েড। এই টনসিল গুলোর কোনো একটির প্রদাহ হলেই তাকে বলে টনসিলাইটিস। টনসিল বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তা কিন্ত আসলে টনসিলাইটিস। আর প্যালাটাইন টনসিলটিই প্রদাহ সৃষ্টি করে আমাদের গলা ব্যথা জাতীয় সমস্যায় ফেলে সবচেয়ে বেশী। টনসিলাইটিস যে শুধু বাচ্চাদের হয় তা নয় এটা বাচ্চাদের বেশী হলেও যে কোনো বয়সেই হতে পারে। এ রোগটি হলে গলা ব্যথা হয়, সেই সাথে তীব্র জর ও থাকে, বাচ্চারা কিছু খেতে চায়না, গলার স্বর পরিবর্তিত হয়ে কিছুটা ভারী হয়ে যায়, সেই সাথে মুখে দুর্গন্ধ, গা ম্যাজ ম্যাজ করা, মাথা ব্যথা, কানে ব্যথা থেকে কোষ্ঠ কাঠিন্য পর্যন্ত হতে দেখা যায়। অনেক সময় গলার বাইরের দিকে দুপাশে বড়ই বিচির মতো দুটি দানা ফুলে উঠতেও দেখা যায়, অনেকে এগুলোকে টনসিল মনে করলেও এরা কিন্ত টনসিল নয়। রোগী বড় করে মুখ হা করলে ভেতরের দিকে যে দুটি বড় দানার মতো দেখা যায় তাই হলো টনসিলাইটিস এ আক্রান্ত টনসিল। টনসিলাইটিস হলে রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হয়। প্যারাসিটামল জাতীয় অসুধ এর ব্যথা ও জ্বর নিবারনে কার্যকরি ভূমিকা রাখে। হাল্কা কুসুম গরম পানিতে সামান্য এন্টিসেপ্টিক বা লবন মিশিয়ে গড়গড়া করলে রোগী আরাম বোধ করে। অনেক রোগীকেই আদা ও লেবু দিয়ে তৈরী র’ চা (Raw Tea) পান করলে স্বস্তি বোধ করতে দেখা যায়। ভিটামিন সি ও এই রোগের উপশমে অবদান রাখে। নাক কান ও গলা বিশেষজ্ঞগন এর চিকিৎসায় সবচেয়ে পারদর্শী। তারা এ রোগের জন্য ৫ থেকে ৭ দিনের এন্টিবায়োটিকের কোর্স দিয়ে থাকেন যা গ্রহনে অধিকাংশ রোগীই দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। তবে কারো যদি বার বার টনসিলাইটিস হয় বা এর জন্য অন্য কোনো জটিলতার সৃষ্টি হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে টনসিল কেটে ফেলে দিতে হয়, একে টনসিলেকটমি অপারেশন বলে। টনসিলেকটমি অপারেশন করিয়ে নিলে কারো আর টনসিলাইটিস হবার কোনো সম্ভাবনা থাকেনা। তাই যারা টনসিল এর সমস্যার জন্য বারবার বিপর্যস্ত হতে চাননা তারা এই স্থায়ী সমাধানের ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

নাক কান গলা ক্যান্সার: সারা শরীরের ক্যান্সারের মত হেড, নেক ক্যানসার ও থাইরয়েড ক্যানসার বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন নাক কান গলা বিষয়ক বিষেশায়িত শাখার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল হেড, নেক, ক্যানসার ও থাইরয়েড ক্যানসার বিষেশায়িত শাখা। বুকের উপর থেকে মাথার উপর পর্যন্ত যে ক্যানসার হয় তাকে হেড, নেক ক্যানসার বলে। এর মধ্যে পড়ে ঠোঁট, জিহ্বা, নাক ও সাইনাস, খাদ্য নালীর উপরের অংশ এবং স্বরযন্ত্র, গলা এবং লালা গ্রন্থির ক্যানসার। হেড, নেক শরীর সবচেয়ে জটিল অংশ, কারণ এখানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ নার্ভ ও রক্ত নালী থাকে যারা ব্রেইনের সাথে শরীরের অন্য অংশের সংযোগ রক্ষা করে। তাছাড়া খাদ্য নালী ও শ্বাস নালীর উপরের অংশ এখানেই অবস্থিত। হেড, নেক ও ক্যানসার চিকিত্সার জন্য প্রয়োজন হেড নেক ক্যানসার সার্জন, প্লাষ্টিক সার্জন পূর্নবাসন বিভাগ ও মনোবিজ্ঞানী। হেড, নেক রিজিয়নে হেড, নেক ও ইএনাটি সার্জন, জেনারেল সার্জন, ফেসিও মেক্সিলারী সার্জন ও হেড নেক ক্যানসার সার্জনরা কাজ করে থাকেন। হেড নেক সার্জনরা হেড নেক এলাকার ক্যানসার এবং অ-ক্যানসার জাতীয় রোগের ও চিকিত্সা করা থাকেন। কিন্তু হেড নেক ক্যানসার সার্জনরা শুধু হেড নেক এলাকার ক্যান্সারের সার্জারী করে থাকেন। সুতরাং একই এলাকার কাজ করলেও তারা দুটি আলাদা গ্রুপ।

আমাদের দেশে প্রতি বত্সর কত সংখ্যক হেড নেক ক্যান্সারের রোগী পাওয়া যায় তার কোন সঠিক পরিসংখ্যায় জানা নেই। ভারতে প্রতি বত্সর ২ লাখের বেশী হেড নেক ক্যান্সারের রোগী শনাক্ত করা হয়। সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ ক্যানসার হয় তার ৫৭.৫০ শতাংশ হয় এশিয়ার বিশেষ করে ভারতে। ৬০-৮০ শতাংশ রোগী এডভান্সড ষ্টেজে ডাক্তারের কাছে যায় যা উন্নত বিশ্বে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশের চিত্র ও ভারতের মতই। হেড নেক ক্যানসার শরীরের মোট ক্যান্সারের ৫ শতাংশ এবং প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে নিরাময় সম্ভব। হেড নেক ক্যান্সারের ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান গুলি হলো, পান, সাবান, জর্দা, সুপারী, ধূমপান, এ্যাকোহল, মুখের অযত্ন, কারখানার ধোঁয়া, ধূলা. রেডিয়েশন এবং ভাইরাস।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>